সূরার নাম

সূরা: আয়াত সংখ্যা: ধরণ: মাক্কী পারা: ০১ সিজদাহ: মাক্কী রুকু: ০১
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰ الرَّحِيْمِ

أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ ﴿١﴾

উচ্চারণ: আলাম তারা কাইফা ফাআলা রাব্বুকা বিআস-হাবিল ফীল।

অর্থ: আপনি কি দেখেননি আপনার পালনকর্তা হস্তীবাহিনীর সাথে কিরূপ ব্যবহার করেছেন?

أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيلٍ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: আলাম ইয়াজআল কাইদাহুম ফী তাদীলীল।

অর্থ: তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি?

وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا أَبَابِيلَ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ওয়া আরসালা আলাইহিম তাইরান আবাবীল।

অর্থ: তিনি তাদের ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে পাখী প্রেরণ করেছেন,

تَرْمِيهِم بِحِجَارَةٍ مِّن سِجِّيلٍ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: তারমীহিম বিহি জারাতিন মিন সিজ্জীল।

অর্থ: যারা তাদের ওপর পাথরের কণা নিক্ষেপ করছিল।

فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَّأْكُولٍ ﴿٥﴾

উচ্চারণ: ফাজাআলাহুম কাআসফিম মাকূল।

অর্থ: অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণসদৃশ করে দিলেন।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আল-ফীল পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সূরা। এই সূরায় মহান আল্লাহ তাআলা কাবার শত্রু আবরাহা ও তার হস্তীবাহিনীর ধ্বংসের ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের বছর এই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটেছিল, যা আল্লাহর অসীম ক্ষমতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. এই সূরা পাঠ করলে শত্রুর অনিষ্ট এবং বড় কোনো বিপদ থেকে আল্লাহর বিশেষ নিরাপত্তা লাভ করা যায়।

২. এটি মুমিনের মনে এই বিশ্বাস দৃঢ় করে যে, আল্লাহ তাঁর ঘর এবং দ্বীনকে রক্ষার জন্য যে কোনো ক্ষুদ্র সৃষ্টি দিয়েও বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করতে পারেন।

৩. অহংকারী এবং অত্যাচারীদের জন্য এই সূরাটি একটি বড় সতর্কবাণী, কারণ আবরাহার মতো শক্তিশালী শক্তিও আল্লাহর ক্ষুদ্র পাখির কাছে ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল।

৪. অনেক আলেম বিপদের সময় এবং শত্রু থেকে বাঁচতে এই সূরাটি নিয়মিত তিলাওয়াতের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

لِإِيلَافِ قُرَيْشٍ ﴿١﴾

উচ্চারণ: লিঈলাফি কুরাইশ।

অর্থ: কুরাইশদের আসক্তির কারণে,

إِيلَافِهِمْ رِحْلَةَ الشِّتَاءِ وَالصَّيْفِ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: ঈলাফিহিম রিহলাতাশ শিতায়ি ওয়াস সাইফ।

অর্থ: আসক্তি তাদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন সফরের।

فَلْيَعْبُدُوا رَبَّ هَٰذَا الْبَيْتِ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ফালইয়া’বুদু রাব্বা হাযাল বাইত।

অর্থ: অতএব তারা যেন এই ঘরের (কাবার) পালনকর্তার ইবাদত করে,

الَّذِي أَطْعَمَهُم مِّن جُوعٍ وَآمنَهُم مِّنْ خَوْفٍ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: আল্লাযী আতআ’মাহুম মিন জূয়িঁও ওয়া আমানাহুম মিন খওফ।

অর্থ: যিনি তাদেরকে ক্ষুধা থেকে বাঁচিয়ে আহার দিয়েছেন এবং ভয়ভীতি থেকে তাদেরকে নিরাপদ করেছেন।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা কুরাইশ মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরায় আল্লাহ তাআলা কুরাইশ বংশের ওপর তাঁর বিশেষ নিয়ামত ও অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। মক্কার কুরাইশরা আরবের অত্যন্ত সম্মানিত বংশ ছিল এবং তারা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য শীত ও গ্রীষ্মকালে নিরাপদে ভ্রমণ করতে পারত। আল্লাহ তাদের জানিয়েছেন যে, এই নিরাপত্তা ও সচ্ছলতা কেবল তাঁরই দান।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. এই সূরাটি পাঠ করলে রিজিকে বরকত লাভ হয় এবং খাদ্যের অভাব দূর হয় বলে অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন।

২. ভ্রমণকালীন সময়ে কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতে এই সূরাটি তিলাওয়াত করা অত্যন্ত উপকারী।

৩. এই সূরার মূল শিক্ষা হলো, আল্লাহ আমাদের যে সব নেয়ামত (খাবার, নিরাপত্তা, বাসস্থান) দিয়েছেন, তার বিনিময়ে কেবল তাঁরই ইবাদত করা উচিত।

৪. ভীতি ও অস্থিরতা দূর করতে এবং মনের প্রশান্তি লাভের জন্য এই সূরাটি নামাজের মধ্যে বা বাইরে পাঠ করা যায়।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

أَرَأَيْتَ الَّذِي يُكَذِّبُ بِالدِّينِ ﴿١﴾

উচ্চারণ: আরাআইতাল্লাযী ইউকাযযিবু বিদ্দীন।

অর্থ: আপনি কি দেখেছেন তাকে, যে পরকালকে অস্বীকার করে?

فَذَٰلِكَ الَّذِي يَدُعُّ الْيَتِيمَ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: ফাযালিকাল্লাযী ইয়াদুউ’ল ইয়াতীম।

অর্থ: সে তো ঐ ব্যক্তি, যে এতিমকে গলা ধাক্কা দেয়,

وَلَا يَحُضُّ عَلَىٰ طَعَامِ الْمِسْكِينِ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ওয়ালা ইয়াহুদ্দু আলা তাআ’মিল মিসকীন।

অর্থ: এবং সে অভাবগ্রস্তকে অন্নদানে উৎসাহ প্রদান করে না।

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: ফাওয়াইলুল লিলমুসাল্লীন।

অর্থ: অতএব সেইসব নামাজীদের জন্য ধ্বংস বা দুর্ভোগ,

الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ ﴿٥﴾

উচ্চারণ: আল্লাযীনাহুম আন সালাতিহিম সাহূন।

অর্থ: যারা তাদের নামাজ সম্বন্ধে উদাসীন;

الَّذِينَ هُمْ يُرَاءُونَ ﴿٦﴾

উচ্চারণ: আল্লাযীনাহুম ইউরাউন।

অর্থ: যারা লোক দেখানোর জন্য তা করে,

وَيَمْنَعُونَ الْمَاعُونَ ﴿٧﴾

উচ্চারণ: ওয়া ইয়ামনাউনাল মাউন।

অর্থ: এবং নিত্য প্রয়োজনীয় সাধারণ ছোটখাটো সাহায্য দানে বিরত থাকে।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আল-মাউন মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরায় মানুষের সেই সব অভ্যাসের নিন্দা করা হয়েছে যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না। কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদত বা নামাজ যথেষ্ট নয়, যদি না মানুষের মধ্যে দয়া, মানবতা এবং অসহায়দের প্রতি মমতা থাকে—এই বাস্তব সত্যটি এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. এই সূরার মাধ্যমে এতিম ও অসহায়দের প্রতি যত্নবান হওয়ার এবং তাদের হক আদায় করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২. লোক দেখানো ইবাদত (রিয়া) যে ধ্বংসের কারণ, এই সূরাটি তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এটি আমাদের একনিষ্ঠ ইবাদত করতে উৎসাহিত করে।

৩. নামাজে অমনোযোগী হওয়া বা অবহেলা করার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে এখানে সতর্ক করা হয়েছে।

৪. ছোটখাটো গৃহস্থালি সাহায্য বা পরোপকার করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা এই সূরার শেষ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ ﴿١﴾

উচ্চারণ: ইন্না আ’তাইনা কাল কাউসার।

অর্থ: নিশ্চয়ই আমি আপনাকে কাউসার (প্রচুর কল্যাণ) দান করেছি।

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: ফাসাল্লি লিরাব্বিকা ওয়ানহার।

অর্থ: অতএব আপনি আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কোরবানি করুন।

إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার।

অর্থ: নিশ্চয়ই আপনার প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারীই তো নির্বংশ (লেজকাটা)।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আল-কাউসার মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পুত্র সন্তানরা শৈশবে ইন্তেকাল করার পর মক্কার কাফেররা তাঁকে 'আবতার' বা নির্বংশ বলে ঠাট্টা করত। তাদের এই উপহাসের জবাবে আল্লাহ তাআলা এই সূরাটি নাযিল করেন। এখানে আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে হাউজে কাউসার এবং অশেষ কল্যাণের সুসংবাদ দিয়েছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে, কাফেররাই আসলে প্রকৃত নির্বংশ।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. এটি কুরআনের সবচেয়ে ছোট সূরা হওয়া সত্ত্বেও এর ভাবার্থ অত্যন্ত গভীর। এটি বিপদের সময় মুমিনের হৃদয়ে আশার আলো জাগায়।

২. এই সূরার মাধ্যমে আল্লাহ নেয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে নামাজ ও কোরবানির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন।

৩. যে ব্যক্তি নিয়মিত এই সূরা পাঠ করবে, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের পানি পান করাবেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে।

৪. এটি সত্যের পথে অবিচল থাকার এবং শত্রুর অপপ্রচারে বিচলিত না হওয়ার শিক্ষা দেয়।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ ﴿١﴾

উচ্চারণ: কুল ইয়া আইয়ুহাল কাফিরুন।

অর্থ: বলুন, হে কাফেরকুল,

لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: লা আ’বুদু মা তা’বুদুন।

অর্থ: আমি এবাদত করি না তোমরা যার এবাদত কর।

وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ওয়া লা আনতুম আবিদুনা মা আ’বুদ।

অর্থ: এবং তোমরাও এবাদতকারী নও আমি যার এবাদত করি।

وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدتُّمْ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: ওয়া লা আনা আবিদুম মা আবাদতুম।

অর্থ: এবং আমি এবাদতকারী নই তোমরা যার এবাদত করে আসছ।

وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ ﴿٥﴾

উচ্চারণ: ওয়া লা আনতুম আবিদুনা মা আ’বুদ।

অর্থ: এবং তোমরাও এবাদতকারী নও আমি যার এবাদত করি।

لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ ﴿٦﴾

উচ্চারণ: লাকুম দীনুকুম ওয়ালিয়া দীন।

অর্থ: তোমাদের ধর্ম তোমাদের জন্য এবং আমার ধর্ম আমার জন্য।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আল-কাফিরুন মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। মক্কার কাফেররা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একটি প্রস্তাব দিয়েছিল যে, এক বছর তারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং পরের বছর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের দেবদেবীর ইবাদত করবেন। এই আপস-প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাআলা এই সূরাটি নাযিল করেন, যেখানে তাওহীদ ও শিরকের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করে দেওয়া হয়েছে।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. এই সূরাটি শিরক থেকে মুক্তির সনদ হিসেবে পরিচিত। ঘুমানোর আগে এটি পাঠ করলে শিরক থেকে মুক্ত থাকা যায় বলে হাদিসে বর্ণিত আছে।

২. রাসূলুল্লাহ (সা.) ফজরের দুই রাকাত সুন্নত এবং মাগরিবের দুই রাকাত সুন্নতে প্রায়ই এই সূরাটি তিলাওয়াত করতেন।

৩. এটি ইসলামের একটি অন্যতম মূলনীতি শিক্ষা দেয়: ইবাদত ও আকিদার ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই।

৪. সূরাটি পাঠ করলে কুরআনের চার ভাগের এক ভাগ পাঠ করার সমান সওয়াব পাওয়া যায় বলে একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

إِذَا جَاءَ نَصْرُ اللَّهِ وَالْفَتْحُ ﴿١﴾

উচ্চারণ: ইযা জাআ নাসরুল্লাহি ওয়াল ফাতহ্।

অর্থ: যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়,

وَرَأَيْتَ النَّاسَ يَدْخُلُونَ فِي دِينِ اللَّهِ أَفْوَاجًا ﴿٢﴾

উচ্চারণ: ওয়া রাআইতান্ নাসা ইয়াদখুলূনা ফী দ্বীনিল্লাহি আফওয়াজা।

অর্থ: এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করতে দেখবেন,

فَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ وَاسْتَغْفِرْهُ ۚ إِنَّهُ كَانَ تَوَّابًا ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ফাসাব্বিহ বিহামদি রাব্বিকা ওয়াস্তাগফিরহু, ইন্নাহু কানা তাওয়্যাবা।

অর্থ: তখন আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয়ই তিনি অতিশয় তওবা কবুলকারী।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আন-নাসর মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটি পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ অবতীর্ণ পূর্ণাঙ্গ সূরা। এই সূরায় মক্কা বিজয়ের সুসংবাদ এবং মানুষের দলে দলে ইসলামে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। একইসাথে এটি ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত বা দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ের একটি ইঙ্গিত।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. এই সূরাটি পাঠ করলে মক্কা বিজয়ের সময় রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে থাকার সমান সওয়াব পাওয়া যায় বলে কোনো কোনো বর্ণনায় উল্লেখ আছে।

২. সাফল্যের চরম শিখরে পৌঁছেও অহংকার না করে আল্লাহর প্রশংসা করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা (এস্তেগফার) করার মহান শিক্ষা এই সূরা থেকে পাওয়া যায়।

৩. এটি মুমিনের জন্য সুসংবাদ যে, আল্লাহর সাহায্য আসলে অতি দ্রুত বিজয় সুনিশ্চিত হয়।

৪. এই সূরাটি পাঠ করলে কুরআনের চার ভাগের এক ভাগ তিলাওয়াতের সওয়াব অর্জিত হয় বলে বর্ণিত আছে।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ ﴿١﴾

উচ্চারণ: তাব্বাত ইয়াদা আবী লাহাবিওঁ ওয়াতাব্ব।

অর্থ: আবু লাহাবের হস্তদ্বয় ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।

مَا أَغْنَىٰ عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: মা আগনা আনহু মালুহু ওয়ামা কাসাব।

অর্থ: তার ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে, তা তার কোনো কাজে আসেনি।

سَيَصْلَىٰ نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: সাইয়াসলা নারান যাতা লাহাব।

অর্থ: সে শীঘ্রই শিখাময় আগুনে প্রবেশ করবে,

وَامْرَأَتُهُ حَمَّالَةَ الْحَطَبِ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: ওয়ামরাআতুহু হাম্মালাতাল হাতাব।

অর্থ: এবং তার স্ত্রীও, যে কাঠ বহনকারিণী;

فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِّن مَّسَدٍ ﴿٥﴾

উচ্চারণ: ফী জীদিহা হাবলুম মিম মাসাদ।

অর্থ: তার গলায় পাকানো রশি নিয়ে।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা লাহাব মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন তাঁর চাচা আবু লাহাব অত্যন্ত অশালীন ভাষায় তাঁর বিরোধিতা করে। আবু লাহাবের সেই ধৃষ্টতা এবং ইসলামের প্রতি তার চরম শত্রুর জবাবে আল্লাহ তাআলা এই সূরাটি নাযিল করেন। এটি কুরআনের একটি অলৌকিক সূরা, কারণ এতে আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ধ্বংসের যে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল, তা তাদের জীবদ্দশাতেই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. এই সূরাটি প্রমাণ করে যে, বংশীয় আভিজাত্য বা নিকটাত্মীয় হওয়া পরকালে কোনো কাজে আসবে না যদি ঈমান না থাকে।

২. ইসলামের শত্রুদের পরিণাম যে অত্যন্ত ভয়াবহ হবে, এই সূরা তার একটি স্পষ্ট ঘোষণা।

৩. আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখত; এই সূরাটি অন্যায় কাজে কাউকে সাহায্য করার পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে।

৪. এটি পাঠের মাধ্যমে ইসলামের সত্যতা এবং পবিত্র কুরআনের ঐশী বাণীর সত্যতা সম্পর্কে মুমিনের হৃদয়ে বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ ﴿١﴾

উচ্চারণ: কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ।

অর্থ: বলুন, তিনি আল্লাহ, এক-অদ্বিতীয়।

اللَّهُ الصَّمَدُ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: আল্লাহুচ্ছামাদ।

অর্থ: আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নন, সবাই তাঁর মুখাপেক্ষী।

لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ।

অর্থ: তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি।

وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।

অর্থ: এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আল-ইখলাস মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। মক্কার মুশরিকরা যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে আল্লাহর বংশপরিচয় বা তাঁর সত্তা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল, তখন এই সূরাটি নাযিল হয়। একে 'তাওহীদ' বা আল্লাহর একত্ববাদের সারসংক্ষেপ বলা হয়। এই সূরার মাধ্যমে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, আল্লাহ একক, অনাদি ও অনন্ত।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. হাদিস অনুযায়ী, এই সূরাটি একবার পাঠ করলে পুরো কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ (তিন ভাগের এক ভাগ) পাঠ করার সমান সওয়াব পাওয়া যায়।

২. যে ব্যক্তি এই সূরাকে ভালোবাসবে (বেশি বেশি পাঠ করবে), সে জান্নাতে প্রবেশ করবে বলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সুসংবাদ দিয়েছেন।

৩. সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমানোর আগে তিনবার এই সূরাটি পাঠ করলে যাবতীয় অনিষ্ট থেকে আল্লাহর সুরক্ষা লাভ করা যায়।

৪. এটি মুমিনের আকিদাহ বা বিশ্বাসকে শিরকমুক্ত ও বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ ﴿١﴾

উচ্চারণ: কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক।

অর্থ: বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের পালনকর্তার,

مِن شَرِّ مَا خَلَقَ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: মিন শাররি মা খালাক।

অর্থ: তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে,

وَمِن شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ওয়া মিন শাররি গাসিকিন ইযা ওয়াকাব।

অর্থ: এবং অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়,

وَمِن شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: ওয়া মিন শাররিন নাফফাসাতি ফিল উকাদ।

অর্থ: এবং গিরায় ফুঁৎকার দিয়ে জাদুকারিণীদের অনিষ্ট থেকে,

وَمِن شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ ﴿٥﴾

উচ্চারণ: ওয়া মিন শাররি হাসিদিন ইযা হাসাদ।

অর্থ: এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আল-ফালাক মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরা এবং পরবর্তী সূরা (আন-নাস)-কে একত্রে 'মুআউবিযাতাইন' বলা হয়। যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর লাবীদ ইবনে আসম নামক এক ইহুদি জাদু করেছিল, তখন আল্লাহ তাআলা এই দুটি সূরা নাযিল করেন। এই সূরাগুলোর মাধ্যমে জাদুর প্রভাব এবং যাবতীয় অনিষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. জাদুটোনা, কুদৃষ্টি (নজর লাগা) এবং অনিষ্টকারী প্রাণীর ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এই সূরাটি একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ।

২. রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে কুল আউযু বিরাব্বিল ফালাক এবং কুল আউযু বিরাব্বিন নাস পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে সারা শরীরে মুছে নিতেন।

৩. মানুষের মনে অন্যের প্রতি হিংসা দানা বাঁধলে তার ক্ষতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা এই সূরায় রয়েছে।

৪. ভীতি ও অস্থিরতা দূর করতে এবং বিশেষ করে শিশুদের সুরক্ষার জন্য এই সূরা তিলাওয়াত করা অত্যন্ত বরকতময়।

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ ﴿١﴾

উচ্চারণ: কুল আউযু বিরাব্বিন নাস।

অর্থ: বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের পালনকর্তার,

مَلِكِ النَّاسِ ﴿٢﴾

উচ্চারণ: মালিকিন নাস।

অর্থ: মানুষের অধিপতির,

إِلَٰهِ النَّاسِ ﴿٣﴾

উচ্চারণ: ইলাহিন নাস।

অর্থ: মানুষের মা’বুদের,

مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ ﴿٤﴾

উচ্চারণ: মিন শাররিল ওয়াসওয়াসিল খান্নাস।

অর্থ: তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দেয় ও আত্মগোপন করে,

الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ ﴿٥﴾

উচ্চারণ: আল্লাযী ইউওয়াসউইসু ফী সুদূরিন নাস।

অর্থ: যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়,

مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ ﴿٦﴾

উচ্চারণ: মিনাল জিন্নাতি ওয়ান নাস।

অর্থ: জ্বিনের মধ্য থেকে হোক অথবা মানুষের মধ্য থেকে।

সূরার গুরুত্ব ও পটভূমি:

সূরা আন-নাস মদিনায় অবতীর্ণ হয়েছে। এটি পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ সূরা। সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস এই দুটি সূরাকে একসাথে 'মুআউবিযাতাইন' বলা হয়, যা সব ধরণের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়ার জন্য নাযিল হয়েছে। এই সূরায় আল্লাহ তাআলা মানুষের গোপন শত্রু অর্থাৎ শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য তাঁর তিনটি গুণাবলির (রব, মালিক ও ইলাহ) মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন।

ফজিলত ও শিক্ষা:

১. শয়তান ও জিনের কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) এবং মানুষের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই সূরাটি সবচেয়ে কার্যকরী মাধ্যম।

২. রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘুমানোর আগে এবং অসুস্থ অবস্থায় এই সূরাটি পাঠ করে নিজের শরীরে ফুঁ দিতেন।

৩. এই সূরার শিক্ষা হলো, মানুষ বা জ্বিন যে কেউই আমাদের মনে খারাপ চিন্তা বা কুমন্ত্রণা দিক না কেন, আমাদের উচিত সাথে সাথে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া।

৪. এটি পাঠের মাধ্যমে অন্তরের অস্থিরতা দূর হয় এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি হয়।